ঈদে বন্ধ, ক্ষতির মুখে সিনেমা শিল্প

চলমান করোনাকাল ধুঁকতে থাকা দেশীয় চলচ্চিত্রের জন্য বয়ে এনেছে বিশাল শঙ্কা। নানা চড়াই উৎড়াই বেয়ে ঘুরে দাঁড়ানো এই শিল্প এবার কতটা ধসের শিকার হতে যাচ্ছে তা অনুমান করতেও শিউরে উঠছেন চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা। তাদের ভয়, একেবারে নিপাট-সচল সিনেমা হলগুলোও আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। আধুনিক বা মাল্টিপ্লেক্সওগুলোও পড়বে বড় ধরনের লোকসানের মুখে। সিনেমায় লগ্নি করা অর্থ সচল না থাকায় এবং করেনার কারণে ঈদ উৎসবেও সিনেমা হলগুলো বন্ধ হওয়ায় সিনেমা খাত সংশ্লিষ্টদের প্রাথমিকভাবে ক্ষতির পরিমাণ ৫০০ কোটি টাকা হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন প্রযোজক সমিতির সভাপতি খোরশেদ আলম খসরু।

গত তিন মাস ধরে হওয়া অব্যাহত লোকসান পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ ছিল ঈদে। কারণ, হলগুলোর টিকে থাকার জন্য সবচেয়ে বড় অর্থের যোগান আসে এই উৎসব থেকে। অথচ এবার করোনাভাইরাসে কারণে ঈদুল ফিতরের উৎসবের সময় সিনেমা হলগুলো থাকবে বন্ধ। চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এই ধাক্কা সামাল দেওয়া অনেক হলমালিক ও প্রযোজকের পক্ষে সামাল দেওয়া ভীষণ কষ্টকর হয়ে পড়বে।

মধুমিতা হলের কর্ণধার ও হল মালিক সমিতির সাবেক নেতা ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ বলেন, ‘কর্মচারীদের মার্চ ও এপ্রিল মাসের বেতন এখনও আমি দিতে পারিনি। আমার প্রতিমাসে বিদ্যুৎ বিলই আসে ৮ লাখ টাকার ওপরে। ভবনের অন্য অংশের ভাড়ার টাকা দিয়ে এখানে থোক বরাদ্দ রাখি। কিন্তু, অন্যদের কাছেও ভাড়া চাইতে পারছি না। নিজের কর্মচারীদের বেতনও দিতে পারছি না। আবার ঈদ। তাদের বোনাসও দিতে পারবো কিনা কে জানে! খুবই মনোকষ্টে আছি। এই হলটা আব্বার স্মৃতি। নইলে কবেই এটি বন্ধ করে দিতাম। করোনার যে পরিস্থিতি; জানি না, ভবিষ্যতে হলের অবস্থা কী হবে।’

সামগ্রিকভাবে হলের পরিস্থিতি নিয়ে এই সংগঠক বলেন, ‘দেশে স্বাভাবিক সময়ে চালু থাকা সিনেমা হলের সংখ্যা একশ’র নিচে। এখন সব বন্ধ। করোনার কারণে গত কয়েক মাসে যে ধকল গেলো, সামনেও যদি এমন চলে দেশের সব সাধারণ হল চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। তারা আর ফিরতে পারবে কিনা সন্দেহ। এক্ষেত্রে সরকারি সহায়তা খুব জরুরি। আমি চাই, প্রধানমন্ত্রীর কাছে সঠিক বার্তাটা কেউ একজন পৌঁছে দিক। করোনার পর অন্তত ৩০ কোটি টাকা বরাদ্দ হলে, হলগুলো বেঁচে যায়।’

দেশের মাল্টিপ্লেক্সগুলোর সাফল্য এসেছে স্টারসিনেপ্লেক্সের হাত ধরে। ঢাকা শহরে তিনটি স্থানে তাদের মাল্টিপ্লেক্স। সিনেমাহলের মোড়ক পরিবর্তন আনা এ প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান মাহবুব রহমান রুহেল। তিনি বলেন, ‘বসুন্ধরা সিটি শপিং মল, সীমান্ত সম্ভার ও মহাখালীতে আমাদের সিনেপ্লেক্স চালু ছিল। এ হলগুলোর ফ্লোর ভাড়া, কর্মীদের বেতন ও অন্যান্য খরচ সব মিলিয়ে মাসে লাগে আড়াই কোটি টাকা। রোজার ঈদ পর্যন্ত সব কর্মচারীদের বেতন আমরা দিয়ে দিয়েছি। বোনাসটা দিতে পারবো কিনা জানি না। তার চেয়ে বড় মাথাব্যথা ব্যাংকের ইন্টারেস্ট। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে অনেক টাকা আমাকে পরিশোধ করতে হয়েছে। জানি না জুনে আবার লোন আমি ম্যানেজ করতে পারবো কিনা।’

এ তো গেল, সিনেমা হলের খরচ। সিনেমা শিল্পে জড়িত আছে আরও অনেক কিছুই। প্রযোজক নেতা খসরু জানালেন, এবারের ঈদকে ঘিরে ৩৫০ কোটি টাকার ওপরে বড় লগ্নি হয়েছিল। যার সবটাই আটকে গেছে।

তিনি বলেন, ‘শাকিব খান, আরিফিন শুভ ও অনন্ত জলিলদের মতো নায়কদের নিয়ে করা বড় বাজেটের ছবি তৈরির পর আটকে আছে। প্রস্তুত আছে ১৪-১৫টি ছবি। অনেকের অর্ধেক কাজ আটকে গেছে। এগুলো কিন্তু ঈদে মুক্তি পেলে, টাকা রোলিং হতো। বড় একটা প্রফিট উঠে আসতো। সেটা আবার পরের ঈদে কাজে লাগতো। ইন্ডাস্ট্রিও কিছুটা স্বস্তি পেতো। আমার প্রাথমিক ধারণা সব মিলিয়ে ৫০০ কোটির টাকার লোকসান হয়ে গেল।’

রোজার ঈদকে টার্গেট করে বানানো বড় বাজেটের ছবি ছিল আরিফিন শুভর ‘মিশন এক্সট্রিম’। এ তালিকায় আছে শাকিব খানের ‘বিদ্রোহী’ ও ‘নবাব এলএলবি’ নামের দুটি চলচ্চিত্র। ঢাকার চলচ্চিত্রে ক্রেইজ সৃষ্টিকারী নায়ক শাকিব খানেরও একটা রেকর্ড করোনায় আটকে গেলো। গত ১৫ বছর ধরে প্রতিটি রোজার ঈদে মুক্তি পেতো শাকিব খান অভিনীত সিনেমা। রেকর্ডটা আরও অনেকদূর টেনে নেওয়ার ইচ্ছা ছিল তার। কিন্তু, তাতে যতিচিহ্ন বসিয়ে দিলো করোনা। এবারের ঈদে করোনা পরিস্থিতিতে তালিকায় থেকেও তার কোনও চলচ্চিত্র মুক্তি পাচ্ছে না। তবে বাস্তববাদী শাকিব খান আর আফসোস করছেন না এজন্য।

শাকিব খানের ভাষ্য, ‘আগে মানুষের জীবন, পরে সিনেমা। গোটা বিশ্বেই এখন একই অবস্থা। এই খারাপ সময় কেটে গেলে, এই যাত্রায় বেঁচে গেলে, নতুন উদ্যমে সবাই মিলে চলচ্চিত্র শিল্প নিয়ে আবার কাজ করবো।’

ঈদকে কেন্দ্র করে মুক্তির আলোচনায় ছিল সিয়াম আহমেদের ‘শান’ ও ইয়াশ রোহানের ‘পরাণ’। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আরও কিছু চলচ্চিত্র ঈদে মুক্তির তালিকায় যুক্ত হতে পারতো। যেমন—‘বিশ্বসুন্দরী’, ‘ঊনপঞ্চাশ বাতাস’, ‘জিন’, ‘শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ-২’, ‘বান্ধব’, ‘মন দেবো মন নেবো’, ‘আমার মা’,‘পাগলের মতো ভালোবাসি’। তালিকাটা হয়তো আরও বড় হতো নিঃসন্দেহে। কিন্তু, করোনায় এসব চলচ্চিত্রের অনেকগুলোর শুটিংই শেষ হয়নি। আর যেগুলো সব শেষ করে তৈরি ছিল সিনেমা হল চালু না থাকায় সেগুলোও আটকে গেছে।

তাহলে সিনেমা হলের ভবিষ্যত কী, আগামীতে এই লোকসান কাটিয়ে ওঠার পথটা কী হতে পারে- জানতে চাইলে স্টার সিনেপ্লেক্সের চেয়ারম্যান মাহবুব রহমান রুহেল বলেন, ‘প্রথমত আমি চাই সরকার কিছুদিনের জন্য হলেও সিনেমা শিল্পের ওপর সব ভ্যাট-ট্যাক্স বন্ধ করে দিক। ইতোমধ্যে বিশ্ব থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশন একটি নীতিমালা জারি করেছে। সেখানে হলের কাঠামো সম্পর্কে সামগ্রিক ধারণা ও প্রদর্শনের নিয়ম-নীতি আছে। এতে আসন দূরত্ব, স্বাস্থ্যবিধির কথা উল্লেখ আছে। যা বুঝতে পারছি, করোনা আরও কিছুদিন থাকবে। কিন্তু আমাদের আবার কর্মক্ষেত্রে ফিরতে হবে। থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশনের নীতিমালা মেনে আমাদের এখানে ভবিষ্যতে যেন হল চালু করা হয়। ব্যক্তিগতভাবে আমি আমার প্রতিষ্ঠানে এ নীতিগুলো চালু করতে যাচ্ছি। আগে যেখানে ২০০ জন বসতেন সেখানে ৬০ প্রবেশ করতে দেবো। যেন নীতিমালার সোশ্যাল ডিসট্যান্স (সামাজিক দূরত্ব) মানা যায়। করোনাভাইরাস আক্রান্ত হওয়ার পর সিনেপ্লেক্সে ডিপ ডিসইনফেকটেন্ট পদ্ধতি চালু করেছিলাম। যেমন- স্টাফদের গ্লাভস ও মাস্ক পরা, দরজার নব নিয়মিত স্যানিটাইজ করা। প্রতি সেশন পর গভীরভাবে ডিসইনফেকটেন্ট করা। সবই চালু করবো। পাশাপাশি সিনেমাপ্রেমীদেরও খুবই সতর্ক হতে হবে। মাস্ক পরে যেন তারা হলে প্রবেশ করেন, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *