কালের গর্ভে বিলীন হতে চলেছে কাউন।

মুহম্মদ তরিকুল ইসলাম, পঞ্চগড় প্রতিনিধিঃ সুস্বাদু একটি ফসলের নাম কাউন। যা গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। এক সময় গ্রামেগঞ্জে ব্যাপকভাবে চাষ হলেও বর্তমানে উন্নত জাত ফসলের প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে হারিয়ে যাচ্ছে এই ঐতিহ্যবাহী কাউন। স্বল্প খরচ, পরিবেশবান্ধব, সহজ চাষ পদ্ধতি ও পানি সাশ্রয়ী হওয়ার পরও শুধুমাত্র মানুষের অবহেলা-অনাদরে কাউনের চাষ আর নেই বললেই চলে।
ফসলটি যেন কালের গর্ভে বিলীন হতে চলেছে। কাউনের বৈজ্ঞানিক নাম ছিটারিয়া ইটালিকা গোত্র-গ্রামিনি। অনেক খোঁজাখুঁজির পর কাউন চাষের দেখা মেলে তেঁতুলিয়া উপজেলার বুড়াবুড়ি ইউপির কালদাসপাড়া গ্রামের কৃষক মফিজুল হকের জমিতে।
কাছে গিয়ে দেখা যায়, বিলুপ্তপ্রায় কাউন ফসলটি তার অস্তিত্ব জানান দিয়ে বলছে, ‘এখনো আমার অস্তিত্ব শেষ হয়ে যায়নি। তবে আমি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে,পারলে আমাকে রক্ষা কর।’
কথা হয় তেঁতুলিয়া উপজেলা সদর ইউপি চেয়ারম্যান ও সম্ভ্রান্ত কৃষক কাজী আনিছুর রহমানের সঙ্গে। তিনি জানান, আগে আমাদের এ অঞ্চলে অনেক জমিতেই কাউন চাষ হতো, এখন আর চোখে পড়ে না। ফসলটির চাষ পদ্ধতি সহজ, স্বল্প খরচ, পানি সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব। শুকনো জমিতে ঝুরঝুরে চাষের পর চৈত্র (এপ্রিল) মাসে বীজ ছিটিয়ে বপন করতে হয়। আষাঢ় (জুলাই) মাসে ফসল ঘরে ওঠে। তিনি আরও জানান, মাঝে একবার নিড়ানি দিলেই হয়, সেচের প্রয়োজন হয় না। ফলন হয় বিঘাপ্রতি ১০-১৫ মণ। বাজারে চাহিদা রয়েছে প্রচুর

তাছাড়া কাউনের শীষ ছিঁড়ে নিয়ে অবশিষ্ট গাছ মাটির সঙ্গে মিশিয়ে জৈব সারের ঘাটতি মেটানো সম্ভব। আবার কেউ কেউ জ্বালানি হিসেবেও ব্যবহার করে। কাউনের ভাত অত্যন্ত সুস্বাদু ও মুখরোচক। জন্ডিস রোগের প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে। পিঠা-পায়েস তৈরিতে এর কোনো জুড়ি নেই।
ভজনপুর ডিগ্রি কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাসুদ জানান, লাভজনক, সুস্বাদু, পরিবেশবান্ধব, স্বল্প খরচে আবাদযোগ্য ও পানি সাশ্রয়ী কাউন নামের দেশি এ ফসলটি যাতে বিলুপ্ত হয়ে না যায় এ জন্য সবার এগিয়ে আসা উচিত। দেশীয় জাতের এ ফসলটিকে আমাদের স্বার্থেই সংরক্ষণ করতে হবে। বর্তমানে বাজারে এর চাহিদা প্রচুর। কৃষি অধিদপ্তর কর্তৃক কৃষককে উৎসাহের মাধ্যমেই পারবে কাউনের আবাদ কে টিকিয়ে রাখতে। তা না হলে পরবর্তী প্রজন্ম জানতেই পারবে না কাউন নামটি।
তেঁতুলিয়া উপজেলা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা এনামুল হক বলেন, কাউন ফসলটি আসলেই বিলুপ্তির পথে। উপজেলায় কয়েকজন কৃষক কাউনের আবাদ করেছেন জানাগেছে। এটি একটি উপকারী ফসল চাহিদাও প্রচুর। আমাদের স্বার্থেই দেশীয় জাতের কাউন ফসলটিকে আমাদের সংরক্ষণ করতে হবে।
তেঁতুলিয়া উপজেলা কৃষি অফিসার জাহাঙ্গীর আলম জানান, কাউন নামের ফসলটি আর নেই বললেই চলে। পুরো উপজেলায় এবার ৪হেক্টর জমিতে কাউনের আবাদ করা হয়েছে। ফসলি জমি কমে যাওয়াই ফসলটি এখন বেশিরভাগ দেখায় যায় না। তিনি আরও জানান, উপজেলার মানুষ এখন বাদাম, ভুট্টা, তিল চাষে বেশি আগ্রহী হয়েছে। তবে প্রতিটি ইউনিয়নে বিলুপ্তির পথে এই ফসলটির চাহিদা বাড়ানোর জন্য উদ্যোগ নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *